• ফেব্রুয়ারী ২৭, ২০২১

প্রাথমিক গণিত (পিকে); অধ্যায়-৮ পাঠ পরিকল্পনা

cover image

অধ্যায়-০৮: পাঠ পরিকল্পনা

পাঠ-৮.১: পাঠ পরিকল্পনা: পাঠ পরিকল্পনা কী ও এর গুরুত্ব, বিবেচ্য বিষয় ও ধাপসমূহ

ক্লাসের আলোচ্য বিষয়:

১) পাঠ পরিকল্পনা বলতে কী বোঝেন?

২) গণিত পাঠ পরিকল্পনার গুরুত্ব ও বিবেচ্য বিষয়গুলো আলোচনা করুন।

৩) গণিত পাঠ পরিকল্পনার ধাপসমূহের বর্ণনা দিন।

৪। গণিত বিষয়ে ৫ম শ্রেণির ‘ভগ্নাংশের গুণ’ সম্পর্কিত একটি পাঠ-পরিকল্পনা তৈরি করুন।

১) পাঠ পরিকল্পনা বলতে কী বোঝেন?

পাঠ পরিকল্পনা হলো কোন কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠ দেওয়ার পূর্বে পাঠটি সম্পর্কে লিখিত দলিল। শ্রেণিকক্ষে পাঠ উপস্থাপনের পূর্বে পাঠটিতে কী পদ্ধতি বা কৌশল ব্যবহার করা হবে, কোন ধরণের উপকরণ ব্যবহার করা হবে, কত সময় ধরে কোন কোন অ্যাক্টিভিটি পরিচালনা করা হবে  এবং কীভাবে করা হবে তার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা।

যে পাঠদান একটি সুনির্দিষ্ট পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয় তাহাই পাঠ পরিকল্পনা। শ্রেণীকক্ষে এ ধরনের পাঠদানের ফলে শিক্ষক যেমন সফল হন তেমনি শিক্ষার্থীরাও স্বত:স্ফূর্তভাবে পাঠে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে এবং তাদের যথাযথ শিখন সম্পন্ন হয়।

২) গণিত পাঠ পরিকল্পনার গুরুত্ব ও বিবেচ্য বিষয়গুলো আলোচনা করুন।

পাঠ পরিকল্পনার গুরুত্ব:

পাঠ পরিকল্পনা হলো পাঠদানের বিষয়বস্তুর ওপর প্রণীত পূর্ব পরিকল্পনা। শিক্ষার্থীদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও চাহিদা সনাক্তকরণ, সংশ্লিষ্ট পাঠের উপযোগী পদ্ধতি ও কৌশলসমূহ নির্ধারণ, পাঠের উদ্দেশ্য ও শিক্ষাক্রমের সাথে এর যোগসূত্র নির্ণয়করণ ও সম্পর্কস্থাপন করার জন্য পাঠ পরিকল্পনার বিকল্প নেই।

নিম্নে পাঠ পরিকল্পনার গুরুত্ব উল্লেখ করা হলো:-

১. এর মাধ্যমে শ্রেণীপাঠকে সফল করে তোলা যায়।

২. পাঠের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।

৩. শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।

৪. কোন পাঠের জন্য কোন কৌশল ও পদ্ধতি উপযুক্ত তা পূর্বেই নির্ধারণ করার ফলে সহজেই শ্রেণিকক্ষে তা প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।

৫. শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ে কর্মতৎপর থাকে।

৬. শিখন কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ করা যায়।

৭. নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা যায়।

৮. বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে পাঠসংশ্লিষ্ট উপকরণ ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

৯. কোন পর্যায়ে কী ধরণের প্রশ্ন করতে হবে তা পূর্বেই নির্ধারণ করা যায়।

১০. পাঠদান শেষে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা যায়।

গণিত পাঠ পরিকল্পনার বিবেচ্য বিষয়সমূহ:

শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকে সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পনা মাফিক পরিচালনা করতে হলে কতকগুলো বিশেষ দিক বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। এসব দিক বিবেচনা করে পাঠদানের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলে সফলভাবে পাঠদান করা সম্ভব হয়। যেমন-

১. পাঠদানের বিষয়বস্তু নির্বাচন।

২. পাঠের আচরণিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ।

৩. পাঠের বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন পর্বে বিন্যাস।

৪. বিষয়বস্তুর সাথে সঙ্গতি রেখে সময় বিভাজন ।

৫. বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে উপকরণ নির্বাচন।

৬. শ্রেণী সংগঠন বা শ্রেণী বিন্যাসের কৌশল নির্ধারণ।

৭. পাঠদান পদ্ধতি ও কৌশল সনাক্তকরণ।

৮. শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক কার্যাবলি নির্ধারণ।

৯. পাঠের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ।

১০. মূল্যায়ন কৌশল নির্ধারণ ইত্যাদি।

৩) গণিত পাঠ পরিকল্পনার ধাপসমূহের বর্ণনা দিন।

গণিত পাঠ পরিকল্পনার ধাপসমূহ:

১. পাঠ পরিচিতি

২. শিখনফল

৩. বিষয়বস্তুর ধারণা

৪. উপকরণ

৫. প্রস্তুতি

৬. উপস্থাপন

৭. মূল্যায়ন

নিম্নে পরিকল্পনার ধাপসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করা হলো:

১. পাঠ পরিচিতি

পাঠ পরিচিতি পর্যায়ে শ্রেণির স্তর, সময়, বিষয়, পাঠের শিরোনাম ইত্যাদির পরিচিতি লিখতে হবে।

২. শিখনফল:

পাঠদান প্রক্রিয়ায় মূল চাবিকাঠি হল শিখনফল বা আচরণিক উদ্দেশ্য। পাঠের শেষে শিক্ষার্থীরা কী কী যোগ্যতা অর্জন করবে অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের চিন্তায়, অনুভূতিতে, দক্ষতায় কী ধরণের পরিবর্তন আশা করা যায় লিখতে হবে। উল্লেখ্য যে, প্রাথমিক শিক্ষাক্রমটি যোগ্যতাভিত্তিক হওয়ায় শিখনফল/আচরণিক উদ্দেশ্যগুলো সুনির্ধারিত থাকে বলে শিক্ষকরা শিক্ষাক্রম অনুসরণ করে শিখনফল নির্ধারণ করবেন।

৩. বিষয়বস্তুর ধারণা:

সংশিষ্ট অধ্যায়ের (উদাহরণস্বরূপ সংখ্যার ধারণা, ভগ্নাংশের ধারণা, প্রাথমিক চার নিয়ম, যোগ, গুণ, সমস্যা সমাধান, চিত্র অঙ্কন, ইত্যাদি) অজর্ন উপযোগী যোগ্যতা, শিখনফল, বিষয়বস্তু পরিসর এবং ক্লাস পিরিয়ডের মেয়াদের কথা বিবেচনায় রেখে একটি অধ্যায়কে কয়েকটি পাঠে বিভক্ত করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা ব্যাহত না করে শিক্ষক প্রয়োজনবোধে সমন্বয় সাধন করতে পারবেন।

৪. উপকরণ:

শিখন শেখানো কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ করতে পাঠের সাথে মিল রেখে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের বিকল্প নেই। উপকরণ ব্যবহারের ফলে পাঠদান আকর্ষণীয় হয়। পাঠের সঙ্গে সম্পতিপূর্ণ উপকরণ ব্যবহার করলে তা শিক্ষার্থীর মনোযোগ ও আগ্রহকে ধরে রাখতে সমর্থ হয়। পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত সহজলভ্য ও স্বল্প বা বিনামূল্যের উপকরণ ব্যবহার ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. প্রস্তুতি:

প্রস্তুতি পর্যায়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ ও সর্ম্পকস্থাপন করবেন।  শ্রেণির পরিবেশকে সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ করতে হবে। অত:পর শিক্ষক শ্রেণিবিন্যাস এবং শ্রেণির পরিবেশ পাঠের উপযোগী করবেন। নতুন পাঠের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বজ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের রয়েছে কি না, প্রশ্নের মাধ্যমে বা আলোচনার মাধ্যমে জেনে নিতে হবে। এভাবে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে পাঠ শিরোনাম ঘোষণা করতে হবে।

৬. শিখন -শেখানো কার্যাবলি

এই পর্যায়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কেননা এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর জ্ঞানভান্ডারকে পরিকল্পিতভাবে সম্মৃদ্ধ করা যায়। নতুন ধারণা গঠনের জন্য বিভিন্ন উদাহরণ ব্যবহার করা যেতে পারে, সমস্যা সমাধানের জন্য সমস্যা অনুযায়ী নানাবিধ উদ্ভাবনীমূলক পদ্ধতি ব্যবহার হতে পারে, দক্ষতা হলে ব্যবহারিক কাজের অনুশীলন হতে পারে। শিখন-শেখানো কার্যাবলির মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী তাদের নিজ নিজ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞানার্জনে অগ্রগামী হবে।

৭. মূল্যায়ন:

পাঠের কাঙ্খিত যোগ্যতা অর্জনে শিক্ষার্থীদের পারদর্শিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মূল্যায়নের বিকল্প নেই। এই পর্যায়ে শিক্ষক যাচাই করে দেখবেন তিনি যে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য পাঠ শুরু করেছিলেন তা কতটা অর্জিত হয়েছে। এই কাজটি তিনি শ্রেণিতে প্রশ্ন করে, শিক্ষার্থীদের আলোচনায় অংশ গ্রহণের সুযোগ দিয়ে, বিভিন্ন সমস্যার মাধ্যমে করতে পারেন। বাড়ীর কাজ প্রদানের মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা যায়। তবে প্রাথমিক স্তরে জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান উপলব্ধি, জ্ঞানের প্রয়োগ উপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি, শিক্ষকের শিখন শেখানো কার্যাবলি পরিচালনা এবং শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের যথার্থতার দিক থেকে পাঠের মূল্যায়ন করা দরকার।

৪। গণিত বিষয়ে ৫ম শ্রেণির ‘ভগ্নাংশের গুণ’ সম্পর্কিত একটি পাঠ-পরিকল্পনা তৈরি করুন।

বিষয়ঃ ভগ্নাংশের গুণ

শ্রেণি: ৫ম

শিখনফল: প্রকৃত ও অপ্রকৃত ভগ্নাংশকে পূর্ণ সংখ্যা দ্বারা গুণ করতে পারবে।

উপকরণ: চার্ট, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট, জ্যামিতিক চিত্র অংকনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ।

কার্যাবলি:

ধাপ-১:

পূর্ব ধারণা পর্যালোচনা করে নিম্নের সমস্যাটি বোর্ডে উপস্থাপন করি। সমস্যাটির ফাঁকা স্থানে কোন সংখ্যাটি বসবে সঠিকভাবে চিন্তা করতে বলুন ১ ডেসিলিটার রং দ্বারা একটি বোর্ডের ৪/৫ বর্গমিটার রং করা যায়। ২/৩ ডেসিলিটার রং দ্বারা বোর্ডটির কত বর্গমিটার রং করা যাবে? শিক্ষার্থীদের ফাকা ঘরে সংখ্যা বসিয়ে সমাধান কী হবে চিন্তা করে বলতে বলি। প্রয়োজনে সহায়তা করি। শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সমস্যাটির সমাধান বোর্ডে করে দেখাই। অতঃপর পর্যায়ক্রমে পূর্ণ সংখ্যা এবং ভগ্নাংশ বসিয়ে সমাধান করতে সহায়তা করি। প্রশ্ন করি যদি ফাঁকা ঘরে ২/৩ বসানো হয় তবে গাণিতিক বাক্য কী হবে? শিক্ষার্থীদের উত্তর বোর্ডে লিখি ৪/৫ × ২/৩ এবং সমাধানে সহায়তা করুন।

ধাপ-২:

৪/৫ × ২/৩ গুণটি চিত্র এঁকে কীভাবে সমাধান করা যায় চিন্তা করতে দেই। বোর্ডে নিম্নরূপ চিত্র আঁকি। ব্যাখ্য দানে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করি।

ধাপ-৩:

শিক্ষার্থীদের দলে ভাগ করে নিম্নের সমস্যা ২টি বিভিন্ন উপায়ে সমাধান করতে সহায়তা করি। দলের কাজ সকলের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন ফ্রিতে দেই । সকলের ধারণা সুস্পষ্ট করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করুন।

১. ১/৩ ×৪

২. ১/৩ × ৩/৪

ধাপ-৪:

দলে আলোচনা করে নিচের সমস্যা ২টি দিয়ে গাণিতিক গল্পের সমস্যা তৈরি করি। দলের কাজ সকলের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করতে দেই। সকলের ধারণা সুস্পষ্ট করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করি।

১. ১/৩ × ৫ = কত?

২. ৩/৪ × ৫/৬ = কত?

ধাপ-৫:

পর্যালোচনা করি আজকের পাঠ থেকে শিক্ষার্থীরা কী কী শিখেছে তা ব্যক্ত করতে সহায়তা। কেউ অপারগ থাকলে সহায়তা করে শিখনফল অর্জন নিশ্চিত করি।

মূল্যায়নঃ

১। তৈরিকৃত পাঠ পরিকল্পনা অনুসরণ করে পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন উপস্থাপন করতে পারবেন।

২। উপস্থাপিত পাঠ নিজে এবং সহকর্মীদের দ্বারা মূল্যায়ন করুন।

৩। মূল্যায়নের মাধ্যমে পাপ্ত ফলাবর্তনের আলোকে পাঠ পরিকল্পনা উন্নয়ন করুন।

icthometech

আগের পোষ্ট

পাঠ পরিকল্পনা কী?

পরের পোষ্ট

প্রাথমিক গণিত (এসকে); অধ্যায়-৩ ভাগ

error: Content is protected !!